তাকলীদের আহ্কাম

মাসয়ালা-১ উছুলে দ্বীনের ক্ষেত্রে মানুষের অবশ্যই ইয়াকীন ও বিশ্বাস থাকতে হবে৷ আর এই ইয়াকীন ও বিশ্বাস যে কোন উপায়ে হাছিল হলেই যথেষ্ট বলে গণ্য হবে যেমন তা যুক্তি ও দলিল ভিত্তিক অথবা পিতা-মাতা ও মুবাল্লিগের বক্তব্য অনুসারে হতে পারে৷ যদিও সে কোন যুক্তি ও দলিল পেশ না করতে পারে৷

মাসয়ালা-২ অপ্রয়োজনীয় আহকামের ক্ষেত্রে মানুষের হয় মুজতাহিদ হতে হবে এবং নিজের ফতোয়া মোতাবেক আমল করবে৷ অথবা, অন্য কোন মুজতাহিদকে তাকলিদ করবে অর্থাত্‍ মুজতাহিদের দেয়া ফতোয়া অনুযায়ী আমল করবে৷ অথবা, যদি সে এহতিয়াত করার প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত থাকে তবে আমলের ক্ষেত্রে এহতিয়াত করবে তবে এ ক্ষেত্রে তাকে ইয়াকিন করতে হবে যে, তার দায়িত সে আঞ্জাম দিয়েছে৷ উদাহরণস্বরূপঃ যদি একদল মুজতাহিদ কোন এক কাজকে হামার মনে করেন এবং অন্য আরেকদল মুজতাহিদ ঐ কাজকে হামার মনে করেন না, সেক্ষেত্রে সে ঐ কাজকে আঞ্জাম দিবে না৷ অথবা একটি কাজকে কেউ বলছেন ওয়াজিব আর কেউ বলছেন মুসতাহাব, এমন কাজকে যদি সে আঞ্জাম দেয় এবং যদি তা সত্যই ওয়াজিব হয়ে থাকে তবে সেক্ষেত্রে এহতিয়াতের প্রক্রিয়ায়ও তা এতহিয়াত করতে হবে৷ অর্থাত্‍ কয়েক পদ্ধতিতে এহতিয়াত করার প্রয়াশ থেকে থাকে তবে সে সব প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করতে হবে যাতে করে কাজটি এহতিয়াত সমমানের হয়৷

মাসয়ালা-৩দায়িত প্রাপ্ত ব্যক্তি যদি মুজতাহিদ না হয়ে থাকে এবং নিজের আমলসমূহকে কোনমুজতাহিদকে তাকলীদ করা ব্যতীরেকেই আঞ্জাম দেয় আর কাউকে তাকলীদও না করে থাকে তবে তার আঞ্জামকৃত আমলসমূহ বাতিল বলে গণ্য হবে৷ অর্থাত্‍ সে তার এই আঞ্জামকৃত আমলকে যথেষ্ট বলে মনে করবে না এবং অবশ্যই ১৩নং মাসয়ালা মোতাবেক আমল করবে৷

মাসয়ালা-৪ তাকলীদের আহ্কামের অর্থ হচ্ছে, কোন মুজতাহিদের নির্দেশ মোতাবেক আমল করা৷ অবশ্যই এমন মুজতাহিদকে তাকলীদ করতে হবেঃ পুরুষ, বালেগ, আক্বল সম্পনড়ব, শিয়া ১২ ইমামী, জীবিত, হালাল যাদা ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে৷ ন্যায়পরায়ণতার অর্থ হচ্ছে, তার নফসকে আয়ত্তে রাখার মতা এতই বেশী যে ওয়াজিব কাজের আঞ্জাম ও গোনাহ্ কবিরা পরিহারের মতা রাখে৷ আর এহতিয়াতে ওয়াজিব হচ্ছে, মার্যায়ে তাকলীদ অবশ্যই যেন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট না হয় এবং অন্যান্য মুজতাহিদের থেকে অধিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হবে, অর্থাত্‍ আল্লাহর হুকুম বোঝার ক্ষেত্রে তিনি যেন সবার থেকে অধিক জ্ঞান সম্পন্ন হন৷

মাসয়ালা-৫ ন্যায়পরায়ণতা বোঝার একটি সহজ উপায় হচ্ছে তার বাহ্যিক ব্যবহার৷ অর্থাত্‍ তার সাথে চলা-ফেরা ও আলাপ-আলোচনা করতে হবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার উপর লক্ষ্য রাখতে হবে যে, সে শরিয়াতী বিষয়সমূহ মেনে চলছে কি চলছে না৷ আরও ল্য রাখতে হবে যে, তার মহল্লার লোকজন তাকে সত্যায়ীত করছে কি না৷

মাসয়ালা-৬ যদি দুটি মুজতাহীদের জ্ঞানের পরিধি একই পর্যায়ের হয়ে থাকে তবে এহতিয়াত করার প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে এখানে যে, যার ভিতর জ্ঞানের গভীরতা একটু বেশী তাকে তাকলীদ করা৷

মাসয়ালা-৭ জ্ঞানী মুজতাহীদকে তিনভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে যা নিমড়বরূপঃ

প্রথমতঃ মানুষ নিজেই মুজতাহীদের ব্যাপারে ইয়াকিন হাসিল করবে অথবা তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে৷ যেমনঃ মানুষ এমন যোগ্যতা অর্জন করেছে যে, তারা জ্ঞানী মুজতাহীদকে চিনতে পারে৷

দ্বিতীয়তঃ দুইজন ন্যায়পরায়ণ আলেম যারা মুজতাহীদ চেনার উপায় আয়ত্ব করেছে তারা যদি কাউকে জ্ঞানী মুজতাহীদ হিসেবে নির্দিষ্ট করেন৷ তবে শর্ত হচ্ছে যে, অন্য দুইজন ন্যায়পরায়ণ আলেম উক্ত ন্যায়পরায়ণ দুইজন আলেমের কথার বিরোধীতা না করেন৷

তৃতীয়তঃ একজন মুজতাহীদের জ্ঞানের পরিধি এতই উর্দ্ধে অবস্থান করে যে, যেকোন স্থানে তার জ্ঞানের পারদর্শিতার কথা শোনা যায়, আর তার জ্ঞানের উপর মানুষের বিশ্বাস হাসিল হয়ে থাকে৷

মাসয়ালা-৮ যদি বিজ্ঞ মুজতাহীদ চেনার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকে তবে অবশ্যই এমন একজনকে তাকলীদ করতে হবে যার উপর ধারনা থাকবে যে, সে জ্ঞানী। আর যদি কারো উপর ধারনা থাকে যে, সে জ্ঞানী কিন্তু পারদর্শি নয় এবং সাথে সাথে অন্য কাউকে জ্ঞানী হিসেবে নির্দিষ্ট না করতে পারে তবে তাকেই তাকলীদ করতে হবে৷ আর এভাবেই যদি জানা থাকে যে, দুইজন জ্ঞানী আলেম আছেন কিন্তু তাদের মধ্যে একজন স্বীকৃতি প্রাপ্ত যে তার গভিরতা বেশী এবং অন্য কেউ এ পর্যায়ে না থাকে তবে তাকেই তাকলীদ করতে হবে৷ আর যদি কয়েকজন অন্যদের থেকে বেশী জ্ঞানী হয়ে থাকে অথবা তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে একে অপরের সমমানের হয়ে থাকে তবে তাদের মধ্যে যে কোন একজনকে তাকলীদ করলেই যথেষ্ট হবে৷

মাসয়ালা-৯ মুজতাহীদের ফতোয়া জানার তিনটি পথ রয়েছে যা নিম্নরূঃ

একঃ সরাসরী মুজতাহীদের কাছ থেকে শোনা৷

দুইঃ দুইজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কাছ থেকে শোনা যারা উক্ত মুজতাহীদের ফতোয়াকে বর্ণনা করে৷ একজন বিশিষ্ট ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কাছ থেকে মুজতাহীদের ফতোয়া শোনাই যথেষ্ট হবে যদি তার উপর বিশ্বাস হাসিল হয়ে থাকে৷

তিনঃ মুজতাহীদের ফতোয়া তার রেসালাহ্তে দেখা তখনই ঠিক হবে যখন মানুষ ঐ রেসালার উপর ইয়াকিন হাসিল করবে, অর্থাত্‍ এটা তার জানতে হবে যে, এই রেসালাহ্তে মুজতাহীদ নিজে অথবা তার পক্ষ থেকে বিশস্ত ব্যক্তি নিযুক্তির মাধ্যমে উক্ত মুজতাহীদের ফতোয়া অনুযায়ী তা লিখিত হয়েছে৷

মাসয়ালা-১০ ওয়াজিব বিষয়সমূহ ও হারাম বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে তাকলীদ করা প্রয়োজনীয় কিন্তু মুতাহাব বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে তাকলীদ করা ওয়াজিব নয় তবে এমন মুসতাহাব যা ওয়াজিব হওয়ার সম্ভাবণা রয়েছে তা ব্যতিরেকে৷

মাসয়ালা-১১ যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ইয়াকিন হাসিল না করছে যে, মুজতাহীদের ফতোয়া পরিবর্তন হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত রেসালেয়ে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার উপর আমল করবে৷ আর যদি জেনে থাকে যে, ফতোয়া পরিবর্তন হয়েছে তবে সে ব্যাপারে গবেষণা করার প্রয়োজন নেই৷

মাসয়ালা-১২ মৃত মুজতাহীদকে তাকলীদ করা জায়েয ততক্ষণ পর্যন্ত যখন মৃত মুজতাহীদ ও জীবিত মুজতাহীদ জ্ঞানের পরিধির ক্ষেত্রে সমমানের হবেন৷ আর যদি তাদের মধ্যে যেকোন একজন জ্ঞানের ক্ষেত্রে বেশী পারদর্শি হয়ে থাকেন তবে তাকে তাকলীদ করতে হবে৷ মৃত মজতাহীদকে তাকলীদ করার ক্ষেত্রে তার যে ফতোয়াগুলোর প্রতি আমল করেছে এবং যে ফতোয়াগুলোর প্রতি আমল করিনি কোন পার্থক্য নেই৷

মাসয়ালা-১৩ একজন জীবিত মুজতাহীদের থেকে অন্য একজন জীবিত মুজতাহীদকে তাকলীদ করার ক্ষেত্রে কোন সমস্য নেই যদি তারা জ্ঞানের দিক দিয়ে সমমানের হয়ে থাকে এবং তা জায়েয৷ কিন্তু যদি একজন আরেক জনের থেকে জ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিক বিজ্ঞ হয়ে থাকেন তবে ঐ বিজ্ঞ মুজতাহীদকে তাকলীদ করা হচ্ছে ওয়াজিব৷

মাসয়ালা-১৪ যখন মার্যায়ে তাকলীদের কোন ফতোয়ার পরিবর্তন হয় তবে মুকাল্লিদের (যে তাকলীদ করে) প্যে ঐ পুরাতন ফতোয়ার উপর আমল করা জায়েয নয়৷ তবে যদি তা এহতিয়াতের পর্যায়ে হয়ে থাকে তবে তা শর্তকতামূলক এহতিয়াতের ভিত্তিতে তার উপর আমল করা কোন অসুবিধা নেই৷

মাসয়ালা-১৫ যদি কোন ব্যক্তি যার উচিত্‍ ছিল কাউকে তাকলীদ করা কিন্তু তাকলীদ বিহীনভাবে ইবাদত করে থাকে এবং এই ইবাদতের পরিমানও তার জানা না থাকে সেক্ষেত্রে উক্ত ইবাদত, যে মুজতাহীদকে তার তাকলীক করা উচিত্‍ ছিল তার ফতোয়া অনুযায়ী হয়ে থাকে তবে তা সঠিক৷ আর এর বিপরীতে ঐ ইবাদতের যতটুকু পরিমান তার স্মরণে আছে তা কাযা করতে হবে৷ তবে কাযা করার ক্ষেত্রে তার বর্তমান মুজতাহীদের দৃষ্টিতে তা আঞ্জাম দেয়াটা ওয়াজিব হয়ে থাকে৷ তবে এহতিয়াতে মুসতাহাব হচ্ছে ঐ ইবাদতে কিছু পরিমান কাযা করা৷

মাসয়ালা-১৬ মুকাল্লিফের উপর ওয়াজিব হচ্ছে প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে (সর্বজ্ঞাতকে তাকলীদ করার ক্ষেত্রে) অথবা (অপ্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে) ঐ বিষয়ে একজন বিজ্ঞ আলেমকে তাকলীদ করবে৷

মাসয়ালা-১৭ যদি একজন মুজতাহীদ ইবাদতের বিষয়ে এবং অন্যজন মুজতাহীদ অন্য একটি বিষয়ের উপর পারদর্শি হয়ে থাকেন তবে মুকাল্লিফ অবশ্যই ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রথম মুজতাহীদকে এবং অন্য বিষয়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মুজতহীদকে তাকলীদ করবে৷

মাসয়ালা-১৮মুকাল্লিফের দায়িত্ব হচ্ছে যখন সে বিজ্ঞ আলেম খোজার পর্যায়ে রয়েছে তখন সে এহতিয়াতের উপর আমল করবে৷

মাসয়ালা-১৯যদি কোন বিজ্ঞ মুজতাহীদ কোন বিষয়ে ফতোয়া দিয়ে থাকে তবে তার মুকাল্লিদ ঐ বিষয়ের ফতোয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোন মুজতাহীদকে তাকলীদ করতে পারবে না৷ কিন্তু যদি ঐ বিষয়ে কোন ফতোয়া না দিয়ে থাকেন বা এহতিয়াতে ওয়াজিব বলে থাকেন তবে সে ক্ষেত্রে মুকাল্লিদ উক্ত এহতিয়াতের উপর আমল করবে অথবা এমন এক মুজতাহীদকে তাকলীদ করবে যে প্রথম মুজতাহীদের থেকে কম জ্ঞান সম্পন্ন অথবা সমমানের৷